অনুদান আত্নসাৎ করে হাজার কোটি টাকার মালিক, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম

87

পর্ব: ১

নিজস্বপ্রতিবেদক: নাম গোলাম আজম, কিন্তু নামের সাথে তার কাজের ধরনটা বেশ আলাদা। কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ (কেএসআর) এবং শারজা চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল (এসসিআই) নামক দুটি আন্তর্জাতিক এনজিও বাংলাদেশে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, মক্তব, এতিমখানা, ওজুখানা, সেলো টিউবওয়েল, ডিপ টিউবওয়েল, সাবমারসিবল পাম্প, দোকান, ঘর ইত্যাদি নির্মাণে অর্থ অনুদান দিয়ে থাকে। এই অনুদানের টাকা সংস্থাটির বাংলাদেশ অফিস থেকে বিতরণ করা হয়।

হানিফ সরকার

তথ্যসূত্রে জানা যায়, কুয়েত সোসাইটি ফর রিলিফ (কেএসআর) এবং শারজা চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল (এসসিআই) এর বাংলাদেশ শাখার সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এই গোলাম আযম। সেই সুযোগে গোলাম আযম সংস্থাটির হাজার কোটি টাকার অনিয়ম করে দেশ-বিদেশে বহু সম্পদের মালিক বনে যান। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সে মালয়েশিয়াতে সেকেন্ড হোম সহ একাধিক রেস্টুরেন্ট, একাধিক কার ওয়াশ, একাধিক সুপার শপ ও বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ির মালিক। এর আড়ালে গোলাম আযম জঙ্গি অর্থায়নের সাথেও জড়িত বলে জানা যায়।

কেননা গোলাম আযমের সরাসরি জামাত-শিবিরের সাথে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায় আর মালয়েশিয়াতে বসে জামাতের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বায়তুল-মালের মাধ্যমে জঙ্গি অর্থায়ন করে থাকে। গোলাম আযমের ছোট ভাই মতিউর রহমান নিজামী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সাবেক সেক্রেটারি ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় ফেরারী আসামি, এছাড়াও সে কয়েক কেজি পরিমাণ বিস্ফোরক নিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়লে বিস্ফোরক আইনে দুই দুইবার জেল খাটে। আরেক ছোট ভাই আবুল আলা মওদুদীর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও সেবনের অভিযোগ পাওয়া গেছে, তার স্ত্রী দিনা’কে এই প্রতিবেদক এর শিবিরের সাথে জড়িত কিনা এমন প্রশ্নে উত্তেজিত হয়ে বলেন, আমি ও আমার দেবরের স্ত্রী আফরিন জামায়াত শিবিরের সাথে জড়িত আর যা পারেন গিয়ে করেন। এছাড়া, গোলাম আযমের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছোট ভাই হাসান আল বান্না তার তত্ত্বাবধানে সাব ঠিকাদার হিসেবে কাজ করতো।

গোলাম আযমের সুপার শপ

গোলাম আযমের পিতা আব্দুল আলী জামায়াত ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সাথে দহরম মহরম ছিল বলে এলাকায় কথিত রয়েছে। এলাকার লোকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছে, আব্দুল আলী জামায়াতে ইসলামীর এতটাই অনুরক্ত ছিল যে তাদের ছেলেদের নাম জামাত ইসলামের বিভিন্ন বড় বড় নেতাদের নামের সাথে মিলিয়ে রাখেন। যেমন- গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আবুল আ’লা মওদুদী।

এছাড়া গোলাম আযম মালয়েশিয়াতে অবৈধ অর্থের মাধ্যমে সুপারশপ সহ যেসব প্রতিষ্ঠান খুলে বসেন তাও আবার জামাতের প্রোডাক্ট হিসেবে খ্যাত বিতর্কিত ইসলামিক বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী’কে দিয়ে উদ্বোধন করেন। যা মালয়েশিয়াতে বসে গোলাম আযমের জামায়াত নীতিতে বিশ্বাসী ও জঙ্গি অর্থায়নের সম্ভাবনাকে আরো দৃঢ় করে। কেউ কেউ এমনটাও বলে, মালয়েশিয়াতে বসে গোলাম আযম বাংলাদেশের বর্তমান সরকার পতনের স্বপ্ন দেখে। আর সেই অনুযায়ী অর্থায়ন করে থাকে।

গোলাম আযমের সুপারশপ উদ্বোধনের সময়

কে এস আর এবং এস সি আই এর বাংলাদেশ শাখার সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হিসেবে দায়িত্বে থাকার সুযোগে গোলাম আযম ব্যাক্তিগত পিয়ন হানিফ সরকারকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ নামে ওই সংস্থার ঠিকাদারির লাইসেন্স নিয়ে দেয়।

এই প্রেক্ষিতে, গোলাম আযম কৌশলে সংস্থার বিভিন্ন কাজ হানিফ এন্টারপ্রাইজের নামে ইস্যু করে দেয়। তারপর গোলাম আজম তার নিজস্ব কিছু লোক দিয়ে সেসব মসজিদের কাজ করিয়ে নেয় নামমাত্র অর্থ ব্যায় করে। সেসব কাজের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অর্থ হানিফ এন্টারপ্রাইজ এর নাম হয়ে পুরোটাই যেত গোলাম আযমের পকেটে।

জানা যায়, হানিফ এন্টারপ্রাইজের চেক বই নিয়ন্ত্রণ করত গোলাম আযম। দুর্নীতির মাধ্যমে মাধ্যমে যে অর্থ হানিফ এন্টারপ্রাইজ এর একাউন্টে জমতো তা গোলাম আযম হানিফ সরকার এর মাধ্যমে মালয়েশিয়াতে পাচার করেছে বলেও জানা গেছে। তার বিনিময়ে হানিফ সরকার পেয়েছে ছিটেফোঁটা।

চিহ্নিত করাদের মধ্যে- বামে গোলাম আযম, মাঝে মিজানুর রহমান আজহারী, ডানে টম

আর তাতেই একসময়ের সাধারন গার্মেন্টস কর্মী হানিফ সরকার হয়ে ওঠেন রাজধানীতে বেশ কয়েকটি বাড়ির মালিক। তাহলে গোলাম আযম মালয়েশিয়াতে কি পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে। যা দিয়ে গোলাম আযম মালয়েশিয়াতে এতসব সম্পদের মালিক বনে গেছেন। এছাড়া আরো কি কি করেছেন তার হিসাব নেই। আর দেশে নামে-বেনামে তার সম্পদের পরিমাণ সীমাহীন।

গোলাম আযমের নামে-বেনামে দেশে রয়েছে কোটি কোটি টাকার অর্থ-সম্পদ। প্রথম স্ত্রী ফাতেমা আক্তার ছবির নামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। আর দ্বিতীয় স্ত্রী খাদিজা আক্তার নিপা’কে বহু সম্পদের মালিক। এছাড়াও দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে এর আগেও একটি সুপার শপ করেছিলেন বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে এসেছে, গোলাম আজমের বিরুদ্ধে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, ওজুখানা সহ অন্যান্য খাতে বিদেশ থেকে আসা অনুদানের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় টাকা পাচার অব্যাহত রেখেছে। এসকল অর্থপাচারে গোলাম আযমকে সহায়তা করছে মালয়েশিয়াতে অবস্থানরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এবং ছদ্মনামধারী টম এবং দুই দেশে অবস্থিত সহযোগীরা।

এ বিষয়ে জানতে রাজধানীর বাড্ডায় গোলাম আযমের বাড়িতে গেলে তার দ্বাররক্ষী জানায় গোলাম আযম বাড়িতে নেই। এরপর তার স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চাইলে দ্বাররক্ষী বলে গোলাম আযমের স্ত্রী কথা বলতে রাজি নন। আর আমরা অন্য এক সূত্র থেকে জানতে পারি, আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গোলাম আযম আর তার ভাইয়েরা গা ডাকা দিয়েছে।

আমরা গোলাম আযমের দ্বাররক্ষীর কাছ থেকে জানতে পারি- গোলাম আযম তার বাড়িতে ব্যাক্তিগত ড্রাইভার এর বাড়িতে কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করে বাড়ি করে দেন।

এসব বিষয়ে জানতে গোলাম আযমের সাথে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করার হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এই অনুসন্ধানের মোট পাঁচ পর্বের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হল। পরবর্তী পর্ব গুলোর জন্য সাথেই থাকুন।