জেড ক্যাটাগরি থেকে উন্নতি হলো ১২ কোম্পানির

12

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে জেড ক্যাটাগরিতে থাকা কোম্পানিকে মন্দ কিংবা নন-পারফর্মিং কোম্পানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মূলত লভ্যাংশ না দেয়া, বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) না করা কিংবা উৎপাদন বন্ধ থাকলে জেড ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয় তালিকাভুক্ত কোম্পানি। তবে অনেক ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত ও প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কারণেও কোম্পানির আর্থিক পারফরম্যান্সে অধোগতি হতে পারে এবং সেটি জেড ক্যাটাগরিতে চলে যায়। সম্প্রতি জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এতে ১২টি কোম্পানি জেড ক্যাটাগরি থেকে তাদের পূর্ববর্তী ক্যাটাগরিতে উন্নীত হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের ব্যবসায়িক অবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ পেয়েছে।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির দায়িত্বে নতুন নেতৃত্ব আসার পর জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনার এ উদ্যোগ নেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি জেড ক্যাটাগরিতে কোম্পানি স্থানান্তরের মানদণ্ড পুনর্নির্ধারণের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়।

বিএসইসির মানদণ্ড কার্যকর করতে গতকাল থেকে স্টক এক্সচেঞ্জে ১২টি কোম্পানি জেড থেকে এ ও বি ক্যাটাগরিতে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে জেড থেকে এ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হয়েছে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, এবি ব্যাংক, প্রাইম ইন্স্যুরেন্স, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর ও লিবরা ইনফিউশনস লিমিটেড। আর জেড থেকে বি ক্যাটাগরিতে উন্নীত হয়েছে বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, সালভো কেমিক্যাল, সাফকো স্পিনিংস মিলস, অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স, জাহিনটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ ও ফু-ওয়াং সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। গেল মঙ্গলবার পর্যন্ত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১৮টি কোম্পানির মধ্যে ৫৪টি জেড ক্যাটাগরিতে ছিল। তবে গতকাল ১২টি কোম্পানির ক্যাটাগরি পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে থাকা কোম্পানির সংখ্যা ৪২টিতে দাঁড়িয়েছে।

জেড ক্যাটাগরি সংক্রান্ত বিএসইসির নতুন আদেশে বলা হয়েছে, পরপর দুই বছর নগদ লভ্যাংশ প্রদান কিংবা এজিএম করতে ব্যর্থ হলে কমিশনের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ‘জেড’ গ্রুপে স্থানান্তর করা যাবে। তাছাড়া ছয় মাস বা তার বেশি সময় কোম্পানির উৎপাদন বা কার্যক্রম বন্ধ থাকলে পরপর দুই বছর নিট পরিচালন লোকসান অথবা পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক থাকলে অথবা কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান তার পরিশোধিত মূলধনের বেশি হলে জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হবে। অবশ্য আইনি কারণে এজিএম করতে না পারলে কিংবা সংস্কার ও বিএমআরইর কারণে ছয় মাসের বেশি উৎপাদন বন্ধ থাকলে জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হবে না। এছাড়া সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গের জন্য কমিশনের অনুমতিক্রমে স্টক এক্সচেঞ্জ কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করতে পারবে।

সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক কোম্পানি হাইডেলবার্গ ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০১৯ হিসাব বছরে প্রথমবারের মতো বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির ১৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বিএসইসির নতুন আদেশ অনুসারে পরপর দুই বছর নগদ লভ্যাংশ না দিলে কিংবা এজিএম না করলে জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হবে। এর ফলে হাইডেলবার্গকে জেড ক্যাটাগরি থেকে উন্নীত করে এর আগে থাকা এ ক্যাটাগরিতে স্থান দেয়া হয়েছে।

এবি ব্যাংক ২০১৭ ও ২০১৮ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ না দিলেও সর্বশেষ ২০১৯ হিসাব বছরে ৫ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে মূলধন ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুসারে স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করতে হয়েছে বলেও জানিয়েছে ব্যাংকটি। কমিশনও এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকটিকে ক্যাটাগরি উন্নীত করা ও আর্থিক অবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ দিয়েছে।

একইভাবে ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০১৯ হিসাব বছরে লভ্যাংশ না দেয়ার কারণে প্রাইম ইন্স্যুরেন্স এবং ৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৯ হিসাব বছরে লভ্যাংশ না দেয়ার কারণে রেনউইক যজ্ঞেশ্বর জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু বিএসইসির নতুন আদেশের কারণে কোম্পানি দুটির ক্যাটাগরি উন্নীত করে আগের এ ক্যাটাগরিতে স্থান দেয়া হয়েছে।

ওষুধ খাতের কোম্পানি লিবরা ইনফিউশনস ৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৯ হিসাব বছরের এজিএম না করার কারণে জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। কমিশনের নতুন নিয়মের ফলে কোম্পানিটি আগের এ ক্যাটাগরিতে ফিরে গেছে।

৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৯ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেয়ার কারণে বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, সালভো কেমিক্যাল ও সাফকো স্পিনিংস মিলসে জেড ক্যাটাগরিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু বিএসইসির নতুন নির্দেশনার কারণে কোম্পানি তিনটি জেড থেকে আগের বি ক্যাটাগরিতে ফিরে এসেছে।

৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৯ হিসাব বছরে এজিএম না করার কারণে অ্যাপোলো ইস্পাত, একই হিসাব বছরে কোনো লভ্যাংশ না দেয়ার কারণে জাহিন টেক্স ও খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। তবে কমিশনের পরিবর্তিত আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানি তিনটি আগের বি ক্যাটাগরিতে ফিরে গেছে।

আর ফু-ওয়াং সিরামিক ৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৯ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও সেটি বিতরণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে জেড ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। তবে বিএসইসির নতুন আদেশের ফলে কোম্পানিটি আগের বি ক্যাটাগরিতে ফিরে এসেছে।

কমিশনের নতুন উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, জেড ক্যাটাগরিতে থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে যেগুলোর অবস্থা তুলনামূলক ভালো, সেগুলোকে আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে চাই। এর অংশ হিসেবেই ১২টি কোম্পানিকে জেড থেকে তাদের আগের ক্যাটাগরিতে উন্নীত করে ব্যবসায়িক অবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ জড়িত রয়েছে। তাই আমরা এগুলোকে যথাসম্ভব নার্সিং করে অবস্থার পরিবর্তন করতে চাইছি।

মানদণ্ড নির্ধারণের পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তালিকাভুক্ত জেড ক্যাটাগরির কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ারে বিক্রি, হস্তান্তর ও প্লেজ বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। জেড ক্যাটাগরিতে থাকা কোম্পানিগুলোকে কমিশনের নির্দেশনা জারির ছয় মাসের মধ্যে এজিএম করতে হবে। সব ধরনের শেয়ার হোল্ডার মিটিং (এজিএম/ইজিএম) ই-ভোটিং/অনলাইন ভোটিংয়ের সুবিধা দিয়ে ডিজিটাল প্লাটফর্মে অথবা হাইব্রিড সিস্টেমে করতে হবে। তাছাড়া জেড ক্যাটাগরিতে থাকা কোম্পানিগুলোকে ৪৫ কর্মদিবসের মধ্যে বিদ্যমান পর্ষদ পুনর্গঠন করতে হবে। পর্ষদ পুনর্গঠনে ব্যর্থ হলে বর্তমান পরিচালক ও উদ্যোক্তারা অন্য কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও পুঁজিবাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে থাকতে পারবেন না। কমিশন এক্ষেত্রে বিশেষ নিরীক্ষক ও কমিশন কর্তৃক পর্যবেক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে পর্ষদ পুনর্গঠন করে জেড ক্যাটাগরির কোম্পানির সুশাসন নিশ্চিত করবে। পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদ চার বছরের মধ্যে কোম্পানির সার্বিক অবস্থার উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হলে স্টক এক্সচেঞ্জ সেই কোম্পানিকে তালিকাচ্যুতিসহ অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।

কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে থাকা ৪২টি কোম্পানির ব্যবসায়িক ও আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করে সবুজ, হলুদ ও লাল শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। সামনের এ কোম্পানিগুলোর মধ্য থেকে আরো কিছু কোম্পানির ক্যাটাগরি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসবে।