বিভিন্ন নীতি সংস্কার ও প্রণোদনার পরেও আলোর মুখ দেখেনি শেয়ারবাজার

5

চলতি বছরে (২০১৯) বিভিন্ন নীতি সংস্কার ও প্রণোদনা দেওয়ার পরেও আলোর মুখ দেখেনি দেশের পুঁজিবাজার। শুধু সরকার’ই নয় পুঁজিবাজারকে তুলে ধরতে সংস্কারমূলক নানা পদেক্ষেপ ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি)। তারপরেও কোনো কাজ হয়নি।

এ বছরে পুঁজিবাজার উন্নয়নের জন্য খাতটির সমস্য ও করনীয় নিয়ে সরব ছিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদ। এছাড়া বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ), ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) অর্থমন্ত্রনালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেরেও (এনবিআর) উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এতকিছুর পরও বাজারকে ঘুরে দাড়াতে দেখা যায়নি। লেনদেন ও সূচকের অবস্থান এখন প্রায় চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিচে।

চলতি বছরে পুঁজিবাজারে মূলত তিনটি কারণে পতন হয়েছে। গত দুই মাসে যে পরিমাণে সূচক কমেছে তার কারণ হচ্ছে বিদেশীদের বিক্রয় এবং গ্রামীণ ফোনের ইস্যু বলে জানান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন।

পুঁজিবাজার সংবা‌দিক‌দের সংগঠন ক্যাপিটাল মা‌র্কেট জার্না‌লিস্টস ফোরামের ‌(সিএম‌জেএফ) কার্যালয় ও ওয়েবসাইট উদ্বোধনকালে তিনি বলেন, পতনতো শুরু হয়েছে যখন এনবিআর চেয়ারম্যান বললো সবাইকে ইনভেস্ট করতে হলে টিআইএন নাম্বার লাগবে। এরপর যখন আমরা তার ভুল ভাঙালাম এবং এটা সংশোধন করলো। এরপর গ্রামীণফোনের সাথে বিটিআরসির যে একটা ঝামেলা শুরু হলো। এটা শুধু গ্রামীণফোনের ক্ষতি করেনি, মার্কেটের কাঠামো ধ্বংস করেছে। কারণ বিদেশিরা যখন আসে তখন ফান্ডামেন্টাল শেয়ার দেখে। বিটিআরসি ও গ্রামীণফোনের দ্বন্ধের কারনে সবগুলোতেই বিক্রি করেছে। শুধুমাত্র গ্রামীণফোন আর বিএটিবিসি বিক্রি করার ফলে বিগত দুই মাসে ১৭৪ পয়েন্ট পরেছে। স্কয়ার ফার্মা, গ্রামীণফোন, ইউনাইটেড পাওয়ার, বিএটিবিসি এবং অলিম্পিক এই ৫টি কোম্পানি মার্কেট পতনের জন্য ৮০ শতাংশই দায়ী।

বছরের শুরুর দিকে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভী প্লেসমেন্ট নিয়ে কথা বললে এবিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি জানান তিনি। পরে বিষয়টি সমাধানের জন্য কমিশনের কাছে ডিএসই প্রস্তাব করলে প্লেসমেন্টের লক-ইন বাড়ানো হয়।

এবং পরবতীর্তে পাবলিক ইস্যু রুলস ২০১৫ সংশোধন করে চূড়ান্ত করা হয়। সংশোধনে মোট ২২টি বিষয় তুলে ধরা হয়। এতে বুক বিল্ডিংয়ে পরিবর্তনসহ আইপিও ইস্যু রুলসেও পরিবর্তন আনা হয়। বুক বিল্ডিংয়ে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কোটা ৬০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর সাধারন বিনিয়োগকারীদের কোটা ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়।

অন্যদিকে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কোটা ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ এবং সাধারন বিনিয়োগকারীদের কোটা ৪০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়। এছাড়া উদ্যোক্তা/পরিচালক ও ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারধারনকারীদের শেয়ারে লক-ইন এর মেয়াদ বাড়ানো,পরিচালকদের পৃথকভাবে ২ শতাংশ ও সম্মিলিতভাবে ৩০ শেয়ার ধারন কড়াকড়ি আরোপ, ঘোষণা ছাড়াই উদ্যোক্তা/পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির রাস্তা বন্ধ, সেকেন্ডারিতে স্বল্প শেয়ারের কারনে কারসাজিরোধে আইপিওতে ফিক্সড প্রাইস মেথডে কমপক্ষে ৩০ কোটি টাকা ও বুক বিল্ডিং মেথডে ৭৫ কোটি টাকা উত্তোলন করা।

এছাড়া ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানির উন্নয়নে কমিটি গঠন, লেনদেনের প্রথমদিন সার্কিট ব্রেকার আরোপ, স্মল ক্যাপ মার্কেট গঠন, অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড বিধিমালা প্রণয়ন, কাস্টমার কমপ্লেইন্ট অ্যাড্রেস মডিউল চালু, ফান্ডের লভ্যাংশ প্রদানের ক্ষেত্রে রি-ইনভেস্টমেন্ট ইউনিট (আরআইইউ) বাতিল ইত্যাদি সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। বিএসইসির পাশাপাশি শেয়ারবাজারকে সহযোগিতার জন্য অর্থমন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্থ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে প্রণোদনা স্কীমের আওতায় আদায়কৃত (সুদ ও আসল) ৮৫৬ কোটি টাকা পুণ:ব্যবহারের অর্থাৎ আবার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সম্মতি দিয়েছে।

আর তারল্য সংকট কাটিয়ে তুলতে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা থেকে অতালিকাভুক্ত ( ইক্যুইটি শেয়ার, নন-কনভার্টঅ্যাবল প্রিফারেন্স শেয়ার, নন-কনভার্টঅ্যাবল বন্ড, ডিবেঞ্চার, ওপেন-ইন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড) সিকিউরিটিজকে বাদ দিয়ে সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাজেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য মুনাফার সর্বনিম্ন অংশ ও নগদ লভ্যাংশে প্রদানে উৎসাহি করা হয়।

গত ২৯ এপ্রিল স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠকে বিতর্কিত প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) পূর্ব প্লেসমেন্টে শেয়ার ইস্যু (ক্যাপিটাল রেইজিং) নিয়ে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। এরপরের দিন, ৩০ এপ্রিল অতালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য প্রাইভেট প্লেসমেন্টে অর্থ উত্তোলন সংক্রান্ত আবেদন গ্রহণ করা হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি। একইসঙ্গে পাবলিক ইস্যু রুল সংশোধন হওয়ার আগে নতুন করে আর কোনো প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদন না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এছাড়া বিনিয়োমসীমা সমাধানে গত ১৬ মে সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এলক্ষ্যে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা থেকে অতালিকাভুক্ত ( ইক্যুইটি শেয়ার, নন-কনভার্টঅ্যাবল প্রিফারেন্স শেয়ার, নন-কনভার্টঅ্যাবল বন্ড, ডিবেঞ্চার, ওপেন-ইন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ড) সিকিউরিটিজকে বাদ দিয়ে সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। যাতে শেয়ারবাজারে ব্যাংক থেকে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো যাবে।

আগামিতে কোম্পানির সম্প্রসারণ, সুষমকরন, আধুনীকরন, পুন:গঠন ও বিস্তার (বিএমআরই) এবং গুণগতমান উন্নয়ন ব্যতিত বোনাস শেয়ার ঘোষণা করা যাবে না বলেও ২১ মে সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। বোনাস শেয়ার ঘোষণার নিয়ে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) প্রকাশের সময় বোনাস শেয়ার ঘোষণার কারন এবং এর বিপরীতে রেখে দেওয়া মুনাফা কোথায় ব্যবহার করা হবে, তা উল্লেখ করতে হবে।

চলতি বছরে সংসদে বাংলাদেশের ৪৯ তম ও বর্তমান সরকারের ১১তম বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোন কোম্পানির নির্দিষ্ট বছরের মুনাফার ৭০ শতাংশের বেশি রিটেইন আর্নিংস, রিজার্ভ বা সারপ্লাস হিসাবে রাখলে, তার উপরে ১০ শতাংশ হারে কর দেওয়ার সংশোধিত প্রস্তাব করা হয়। অর্থাৎ ৭০ শতাংশের বেশি রিজার্ভে রাখার ক্ষেত্রে, পুরো অংশের উপরে ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। এছাড়া নির্দিষ্ট বছরে নগদ লভ্যাংশের থেকে বেশি বোনাস শেয়ার ঘোষণা বা বিতরন করলে, তার উপরে ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আর নগদ লভ্যাংশ না দিলেও বোনাস শেয়ারের উপরে ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

গত ১৬ জুলাই বুক বিল্ডিং পদ্ধতির সংশোধনীর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে প্রস্তাবিত দরেই শেয়ার কিনতে হবে নিলামে অংশগ্রহনকারীদেরকে। এছাড়া যে পরিমাণ শেয়ার কেনার জন্য দর প্রস্তাব করবে, সেই পরিমাণ কিনতে হবে বলে বিএসইসি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। ওই দিনেই বুক বিল্ডিং সংশোধনীর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মিউচ্যুয়াল ফান্ডের লভ্যাংশ প্রদানের ক্ষেত্রে রি-ইনভেস্টমেন্ট ইউনিট (আরআইইউ) পদ্ধতি বাতিল করে বিএসইসি। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা ৬৬ অনুযায়ী লভ্যাংশ প্রদানের ক্ষেত্রে রি-ইনভেস্টমেন্ট ইউনিট (আরআইইউ) পদ্ধতি এখন বাতিল। ফলে বে-মেয়াদী এবং মেয়াদী উভয় ধরণের ফান্ডের ক্ষেত্রেই কেবল মাত্র নগদ লভ্যাংশ প্রদান করা যাবে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর উন্নত পুঁজিবাজার গঠনের লক্ষে বিনিয়োগকারীদের সকল সমস্যা এবং অভিযোগ সম্পর্কে জানতে অনলাইন মডিউল চালু করেছে বিএসইসি। ‘কাস্টমার কমপ্লেইন্ট অ্যাড্রেস মডিউল’ (সিসিএএম) নামে তৈরি করা এই সফটওয়্যার আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়।

গত ২৮ অক্টোবর বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেনের পরামর্শে স্বচ্ছ ও ভালো কোম্পানি আনয়নের লক্ষ্যে আইপিও রিভিউ টিম গঠন করেছে ডিএসই।

ডিএসইর দাবিতে গত ১৫ নভেম্বর আইপিও কোম্পানি বাজারে লেনদেনের প্রথমদিন সার্কিট ব্রেকার আরোপের নতুন নিয়ম চালু করে কমিশন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী লেনদেনের প্রথম দিন কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরে ৫০ শতাংশ সার্কিট ব্রেকার নির্ধারণ করা হয়েছে। লেনদেনের দ্বিতীয় দিনে প্রথম দিনের শেয়ারের দর বাড়া বা কমার উপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সার্কিট ব্রেকার থাকবে। আর তৃতীয় দিন থেকে নতুন নিয়ম অনুযায়ী সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হবে।

গত ২৭ নভেম্বর কমিশন ব্রোকারেজ হাউজগুলোর এক্সটেনশন (বর্ধিত) অফিস খোলার সীমা ২ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আয়তন পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। আর ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড) বিধিমালা, ২০১৯ কিছু সংশোধন সাপেক্ষে অনুমোদন দিয়েছে বিএসইসি।

এছাড়া বছর জুড়েই ছিল পুঁজিবাজারে অনিয়মকরীদের শাস্তি ও জরিমানা। অডিটে অনিয়মের কারণে অডিট ফার্মকে জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিল, শেয়ার লেনদেনের কারসাজিতে বিনিয়োগকারী, ব্রোকার হাউজ ও পরিচালকদেরকে জরিমানা ও শাস্তি। বছর জুড়ে আলোচিত ছিল স্বপ্ন নিয়ে এসিআই প্রশ্নবিদ্ধ, কপারটেকের লিস্টিং ও আর্থিক প্রতিবেদনে গড়মিল, মুন্নু জুট ও সিরামিকের কারসাজি। এবং সব শেষে ডিএসইর নির্বাচন ও নতুন ইনডেক্স চালু।